ই-পাসপোর্ট আবেদন করার সম্পূর্ণ নিয়ম ২০২৬: অনলাইনে ফর্ম পূরণ থেকে ফি জমা পর্যন্ত

Table of contents
Telegram chanel Join our Telegram channel
Join
Spread the love

বিদেশে যাত্রা, উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা পর্যটনের জন্য আন্তর্জাতিক ভ্রমণ দলিল হিসেবে পাসপোর্ট একটি অপরিহার্য উপাদান। বাংলাদেশে বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তি সমৃদ্ধ ই-পাসপোর্ট (e-Passport) প্রদান করা হচ্ছে, যা মাইক্রোচিপভিত্তিক অত্যন্ত নিরাপদ একটি মাধ্যম। পাসপোর্ট করার কথা ভাবলেই অনেকের মনে বিভিন্ন প্রশ্ন ও জটিলতার ভয় জাগ্রত হয়। তবে সঠিক নিয়ম জানা থাকলে বর্তমানে ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করা অত্যন্ত সহজ এবং নিরাপদ।অনলাইনে ই-পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম অনুসরণ না করে তাড়াহুড়ো করে ফর্ম পূরণ করতে গেলে ছোটখাটো ভুলের কারণে পরবর্তীতে বড় ধরণের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। যেমন— বানান ভুল, এনআইডি (NID) বা জন্মনিবন্ধনের সাথে তথ্যের গরমিল থাকা কিংবা ভুল ক্যাটাগরি বাছাই করা। এসব ভুল সংশোধন করতে পাসপোর্ট অফিসে বারবার দৌড়াদৌড়ি করতে হয় এবং মূল পাসপোর্ট পেতে অনেক বিলম্ব ঘটে। তাই অনলাইন ফর্ম পূরণ শুরু করার আগেই এর প্রতিটি ধাপ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ফি সম্পর্কিত তথ্যাদি পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ই-পাসপোর্ট কী?

ই-পাসপোর্ট বা ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট হলো চিরাচরিত পাসপোর্টের একটি আধুনিক রূপ। এর কভার পৃষ্ঠার ভেতরে একটি ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক মাইক্রোচিপ বসানো থাকে। এই চিপে পাসপোর্টধারীর ছবি, নাম, ঠিকানা, আঙুলের ছাপ, চোখের আইরিশ স্ক্যানসহ যাবতীয় বায়োমেট্রিক ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত অবস্থায় সংরক্ষিত থাকে। বিমানবন্দর বা ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে থাকা ই-গেট (e-Gate) দিয়ে ই-পাসপোর্টধারীরা অত্যন্ত দ্রুত ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইমিগ্রেশন পার হতে পারেন, ফলে কোনো দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর প্রয়োজন হয় না।

ই-পাসপোর্ট করতে কারা আবেদন করতে পারবেন?

বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক নিয়ম মেনে ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারেন। সাধারণ যোগ্যতার ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী কিছু নির্ধারিত বিষয় মাথায় রাখতে হয়:

  • প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক (১৮ বছর বা তার বেশি): ১৮ বছর বা তার চেয়ে বেশি বয়সী নাগরিকদের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকা সাপেক্ষে আবেদনের সুযোগ রয়েছে।
  • অপ্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক (১৮ বছরের নিচে): ১৮ বছরের কম বয়সী আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে ডিজিটাল অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ (BRC) ব্যবহার করে আবেদন করা যায়। তবে বয়স ৬ বছর বা তার বেশি হলে বায়োমেট্রিক তথ্য (আঙুলের ছাপ ও আইরিশ) প্রদান করতে হয়।
  • নতুন ও রিনিউয়াল আবেদনকারী: যারা জীবনে প্রথমবার পাসপোর্ট করছেন তারা যেমন আবেদন করতে পারবেন, তেমনি যাদের আগের হস্তলিখিত  বা এমআরপি (MRP) পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তারাও ই-পাসপোর্টে রূপান্তরের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

ই-পাসপোর্ট আবেদন করতে কী কী কাগজপত্র লাগবে?

আবেদনপত্রের সাথে জমা দেওয়ার জন্য সঠিক ও হালনাগাদ কাগজপত্র সঙ্গে প্রস্তুত রাখা বাধ্যতামূলক। নিচে প্রয়োজনীয় মূল কাগজপত্রগুলোর বিবরণ দেওয়া হলো:

জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ (BRC): ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এনআইডি কার্ডের ফটোকপি এবং মূল কপি লাগবে। ১৮ বছরের নিচে হলে ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদের কপি প্রয়োজন হবে।

অনলাইন আবেদনপত্রের সারাংশ (Application Summary): অনলাইনে সফলভাবে ফর্ম জমা দেওয়ার পর ডাউনলোড করা সামারি পৃষ্ঠা যা প্রিন্ট করে নিতে হবে।

আবেদন ফর্মের কপি (Application Form): পুরো অনলাইন আবেদনের যে ফাইলটি পিডিএফ (PDF) হিসেবে নামানো যায়, সেটির এক সেট প্রিন্ট কপি।

বিশেষ নোট: বর্তমানে নতুন নিয়মে অনলাইনে ফি পরিশোধ করা হলে অথবা ব্যাংক চালানের মাধ্যমে ফি দেওয়া হলে ফি পেমেন্টের রসিদ বা চালান সাথে যুক্ত করতে হবে।

পূর্ববর্তী পাসপোর্টের মূল কপি ও ফটোকপি (যদি থাকে): আগে যদি আপনার এমআরপি বা পুরোনো ই-পাসপোর্ট থেকে থাকে, তবে পাসপোর্ট জমা দিতে হবে এবং এর প্রথম পাতার ফটোকপি যুক্ত করতে হবে।

পেশাগত প্রমাণপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে): সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের ক্ষেত্রে NOC (No Objection Certificate) বা GO (Government Order) লাগবে। শিক্ষার্থী হলে স্টুডেন্ট আইডি কার্ড এবং অন্যান্য পেশার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক প্রমাণপত্রের প্রয়োজন হতে পারে।

নাগরিকত্ব বা চেয়ারম্যান সনদ: স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর কর্তৃক প্রদত্ত নাগরিকত্ব সনদের মূল কপি সঙ্গে রাখা ভালো।

পিতামাতার NID বা জন্মনিবন্ধন: ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের আবেদনের ক্ষেত্রে বাবা এবং মায়ের এনআইডি কার্ডের কপি প্রদান বাধ্যতামূলক।

ই-পাসপোর্ট আবেদন করার আগে যেসব তথ্য প্রস্তুত রাখবেন

অনলাইনে ই-পাসপোর্ট ফর্ম পূরণ শুরু করার আগে একটি কাগজে বা নোটপ্যাডে আপনার তথ্যগুলো লিখে নিন। জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদের সাথে এই তথ্যগুলোর অক্ষর ধরে ধরে মিল থাকা প্রয়োজন:

নিজের নামের সঠিক বানান: বাংলায় ও ইংরেজিতে আপনার নামের প্রতিটি বানান NID বা জন্মনিবন্ধনের হুবহু হতে হবে।

জন্মতারিখ ও স্থান: সরকারি পরিচয়পত্রে দেওয়া জন্মতারিখ ও জেলা সঠিকভাবে জেনে রাখুন।

বাবা-মায়ের সঠিক তথ্য: বাবা ও মায়ের নাম, তাদের এনআইডি নম্বর এবং পেশা সম্পর্কিত তথ্য।

বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা: আপনার পাসপোর্ট কোন অঞ্চলের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে (RPO) জমা হবে তা ঠিক হয় স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানার ওপর। তাই পোস্ট অফিস, পোস্টাল কোড, থানা ও জেলা সঠিকভাবে নির্বাচন করতে হবে।

যোগাযোগের তথ্য: একটি সক্রিয় ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর এবং ই-মেইল ঠিকানা, যাতে ওটিপি (OTP) ও স্ট্যাটাস মেসেজ পাওয়া যায়।

জরুরি যোগাযোগ (Emergency Contact): জরুরি পরিস্থিতিতে কার সাথে যোগাযোগ করা হবে তার নাম, সম্পর্ক, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর।

অনলাইনে ই-পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম

ই-পাসপোর্ট অনলাইন আবেদনের পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপ অনুযায়ী নিচে ব্যাখ্যা করা হলো। বাংলাদেশের ই-পাসপোর্টের নির্ধারিত সরকারি ওয়েবসাইট (www.epassport.gov.bd) ব্যবহার করে এই কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।

ধাপ ১: সরকারি পোর্টালে প্রবেশ ও অ্যাকাউন্ট তৈরি

প্রথমে নির্ধারিত সরকারি ই-পাসপোর্ট পোর্টালে প্রবেশ করুন। সেখানে “Apply Online” বাটনে ক্লিক করুন। প্রথমেই আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হবে আপনার বর্তমান ঠিকানা বা স্থায়ী ঠিকানা বাংলাদেশে কিনা। হ্যাঁ নির্বাচন করে আপনার জেলা এবং নিকটস্থ থানা নির্বাচন করুন। এটি আপনার সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস নির্ধারণ করবে। এরপর সচল ই-মেইল দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার কাজ সম্পন্ন করুন। ই-মেইলে প্রাপ্ত ভেরিফিকেশন লিংকে ক্লিক করে অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করুন।

ধাপ ২: নতুন আবেদন শুরু ও ব্যক্তিগত তথ্য প্রদান

অ্যাকাউন্টে লগইন করে “Apply for a new passport” নির্বাচন করুন। এবার আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হবে। যেমন— লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা, ধর্ম, পেশা এবং যোগাযোগের নম্বর। এখানে আপনার নাম এবং জন্মসংক্রান্ত সমস্ত বিবরণ NID বা অনলাইন BRC অনুযায়ী নির্ভুলভাবে প্রদান করতে হবে।

ধাপ ৩: পরিচয় ও ঠিকানার তথ্য নির্বাচন

পরবর্তী ধাপে বর্তমান ঠিকানা ও স্থায়ী ঠিকানা পূরণ করতে হবে। উভয় ঠিকানা এক হলে সংশ্লিষ্ট ঘরে টিক চিহ্ন দিন। এরপর আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বর অথবা ১৭ ডিজিটের ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন নম্বর সতর্কতার সাথে প্রবেশ করান।

ধাপ ৪: পাসপোর্টের ধরন ও মেয়াদ নির্বাচন

এখানে আপনাকে পাসপোর্টের ধরণ বেছে নিতে হবে। সাধারণত ই-পাসপোর্ট দুই ধরণের পৃষ্ঠাসংখ্যা ও মেয়াদে পাওয়া যায়:

  • ৪৮ পৃষ্ঠা এবং ৫ বছর মেয়াদ
  • ৪৮ পৃষ্ঠা এবং ১০ বছর মেয়াদ
  • ৬৪ পৃষ্ঠা এবং ৫ বছর মেয়াদ
  • ৬৪ পৃষ্ঠা এবং ১০ বছর মেয়াদ

আপনার প্রয়োজন ও বাজেট অনুযায়ী মানানসই অপশনটি নির্বাচন করুন।

ধাপ ৫: ডেলিভারির ধরন নির্ধারণ

জরুরিভিত্তিতে পাসপোর্ট পাওয়ার ওপর ভিত্তি করে ডেলিভারির প্রকার নির্বাচন করতে হবে। সাধারণত তিন ধরনের ডেলিভারি অপশন রয়েছে: Regular (সাধারণ), Express (জরুরি) এবং Super Express (অত্যন্ত জরুরি)। প্রতিটি অপশনের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি ফি আলাদা হয়।

ধাপ ৬: আবেদন ফর্ম পুনঃযাচাই (Review) ও ফাইনাল সাবমিট

আবেদনপত্র জমা দেওয়ার পূর্বে একটি প্রিভিউ স্ক্রিন আসবে। এখানে আপনার পূরণ করা প্রতিটি তথ্য আবার গভীরভাবে পড়ে নিন। বানান বা তথ্যে কোনো সামান্য ভুল চোখে পড়লে সাথে সাথে সংশোধন করুন। সব তথ্য সঠিক নিশ্চিত হলে “Submit” বাটনে ক্লিক করে আবেদনটি জমা দিন।

পুরানো হস্তলিখিত  জন্ম সনদকে ডিজিটাল (17-digit) করার সঠিক নিয়ম: পুরনো রেজিস্ট্রি বুক খুঁজে পাওয়ার উপায় পুরানো হস্তলিখিত জন্ম সনদকে ডিজিটাল (17-digit) করার সঠিক নিয়ম: পুরনো রেজিস্ট্রি বুক খুঁজে পাওয়ার উপায় Jonmo Nibondhon August 11, 2026

ই-পাসপোর্ট ফর্ম পূরণের সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

ই-পাসপোর্টের আবেদন বাতিল বা স্থগিত হওয়া এড়াতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত:

NID বা BRC-এর সাথে তথ্যের অমিল: আপনার NID বা অনলাইন জন্মসনদে যেভাবে নাম, পিতার নাম ও জন্মতারিখ লেখা আছে, ফর্মে ঠিক সেভাবেই লিখুন। একটি অক্ষরের গরমিল হলেও সার্ভার ডেটা ম্যাচ করতে ব্যর্থ হবে।

স্থায়ী ঠিকানার সঠিক তথ্য: স্থায়ী ঠিকানার ওপর ভিত্তি করেই পুলিশ ভেরিফিকেশন পরিচালিত হয়। তাই স্থায়ী ঠিকানার থানা বা ডাকঘর ভুল লিখলে তদন্তে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।

আগের পাসপোর্টের তথ্য গোপন না করা: আগে যদি আপনার কোনো এমআরপি বা ই-পাসপোর্ট থাকে, তবে অবশ্যই “Re-issue” অপশনে গিয়ে পুরানো পাসপোর্টের বিবরণ দিতে হবে। পুরোনো তথ্য গোপন করলে পরবর্তীতে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

ই-পাসপোর্টের ফি কত?

বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ই-পাসপোর্টের সরকারি ফি বয়স, পৃষ্ঠাসংখ্যা, মেয়াদ ও ডেলিভারির ধরনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। সর্বমোট ফি-এর সাথে ১৫% ভ্যাট (VAT) যুক্ত হয়। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সাধারণ ফি এর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

পাসপোর্টের পৃষ্ঠা মেয়াদ ডেলিভারির ধরন মোট সরকারি ফি (১৫% ভ্যাটসহ)
৪৮ পৃষ্ঠা ৫ বছর সাধারণ (Regular) ৪,০২৫ টাকা
৪৮ পৃষ্ঠা ৫ বছর জরুরি (Express) ৬,৩২৫ টাকা
৪৮ পৃষ্ঠা ৫ বছর অতি জরুরি (Super Express) ৮,৬২৫ টাকা
৪৮ পৃষ্ঠা ১০ বছর সাধারণ (Regular) ৫,৭৫০ টাকা
৪৮ পৃষ্ঠা ১০ বছর জরুরি (Express) ৮,০৫০ টাকা
৪৮ পৃষ্ঠা ১০ বছর অতি জরুরি (Super Express) ১০,৩৫০ টাকা
৬৪ পৃষ্ঠা ৫ বছর সাধারণ (Regular) ৬,৩২৫ টাকা
৬৪ পৃষ্ঠা ৫ বছর জরুরি (Express) ৮,৬২৫ টাকা
৬৪ পৃষ্ঠা ১০ বছর সাধারণ (Regular) ৮,০৫০ টাকা
৬৪ পৃষ্ঠা ১০ বছর জরুরি (Express) ১০,৩৫০ টাকা
৬৪ পৃষ্ঠা ১০ বছর অতি জরুরি (Super Express) ১২,৬৫০ টাকা

বিশেষ দ্রষ্টব্য: সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফি যেকোনো সময় পরিবর্তনশীল। আবেদনের সময় পোর্টালের দেখানো মূল হিসাব নিশ্চিত করুন।

ই-পাসপোর্টের ফি জমা দেওয়ার নিয়ম

বর্তমানে ই-পাসপোর্টের ফি প্রদান পদ্বতি বেশ আধুনিক ও সহজ। আপনি দুটি পদ্ধতিতে পরিশোধ করতে পারেন:

  • অনলাইন পেমেন্ট : ফর্ম সাবমিট করার পর পোর্টালেই সরাসরি ই-পেমেন্ট করা যায়। মোবাইল ব্যাংকিং (যেমন: বিকাশ, নগদ, রকেট), ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড এবং ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফি প্রদান সম্ভব।
  • অফলাইন বা ব্যাংক চালান: আপনি চাইলে এ কে বা অটোমেটেড চালান (A-Challan) ব্যবহার করে নির্ধারিত সরকারি বা বেসরকারি অনুমোদিত ব্যাংকে (যেমন: সোনালী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ওয়ান ব্যাংক ইত্যাদি) টাকা জমা দিয়ে চালানের তথ্য অ্যাপ্লিকেশনে যোগ করতে পারেন।

টাকা জমা দেওয়ার পর পেমেন্ট কনফার্মেশন রসিদ বা চালান সংগ্রহ করে নিরাপদ স্থানে প্রিন্ট করে রাখুন। বায়োমেট্রিক দেওয়ার দিন এটি কাউন্টারে দেখাতে হবে।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও বায়োমেট্রিক দেওয়ার নিয়ম

অনলাইন ফর্ম জমা এবং ফি পরিশোধের কাজ সফল হলে আবেদনকারীকে একটি নির্দিষ্ট দিনে পাসপোর্টের আঞ্চলিক অফিসে বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার জন্য উপস্থিত হতে হয়।

অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিডিউল: অনলাইন আবেদনে তারিখ বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে। নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট সময়ে সংশ্লিষ্ট অফিসে প্রয়োজনীয় সকল মূল কাগজপত্র ও প্রিন্ট কপিসহ উপস্থিত হতে হবে।

কাউন্টারে কাগজপত্র পরীক্ষা: অফিস কাউন্টারে আপনার আবেদন ফর্মে উল্লেখিত সকল মূল কাগজপত্র যাচাই করা হবে।

বায়োমেট্রিক গ্রহণ: তথ্য যাচাইয়ের পর আপনার ছবি তোলা হবে, ১০ আঙুলের ছাপ (Fingerprint) নেওয়া হবে এবং চোখের মনি বা আইরিশ স্ক্যান (Iris Scan) সম্পন্ন করা হবে। একই সাথে ই-পাসপোর্টের জন্য আপনার স্বাক্ষর নেওয়া হবে।

ডেলিভারি স্লিপ সংগ্রহ: কাজ শেষ হলে অফিস থেকে আপনাকে একটি “Delivery Slip” বা প্রাপ্তিস্বীকার পত্র প্রদান করা হবে। পাসপোর্ট সংগ্রহের দিন এটি সাথে রাখা বাধ্যতামূলক।

ই-পাসপোর্ট আবেদন করার পর স্ট্যাটাস দেখার নিয়ম

আবেদন জমা ও বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হওয়ার পর পাসপোর্ট প্রসেসিংয়ের আপডেট অনলাইনে সহজেই ট্র্যাক করা সম্ভব।

  1. ই-পাসপোর্ট পোর্টালের “Check Status” মেনুতে যান।
  2. আপনার আবেদনের Application ID (যেমন: 1000-000000000) অথবা ডেলিভারি স্লিপে থাকা Enrollment ID দিন।
  3. আপনার জন্মতারিখ প্রবেশ করান।
  4. ক্যাপচা (Captcha) পূরণ করে “Check” বাটনে চাপ দিন।

এখানে আবেদনের বর্তমান অবস্থা (যেমন: Pending Police Clearance, Approved, Printed, Ready for Delivery) দেখা যাবে।

ই-পাসপোর্ট পেতে কতদিন লাগে?

পাসপোর্ট কত দিনে পাওয়া যাবে তা নির্ভর করে আপনার নির্বাচিত ডেলিভারি অপশন এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার ওপর। সাধারণত সময়সীমাগুলো নিম্নরূপ:

  • সাধারণ ডেলিভারি (Regular): আবেদন ও বায়োমেট্রিক শেষ হওয়ার পর সাধারণত ১৫ থেকে ২১ কর্মদিবস লাগে।
  • জরুরি ডেলিভারি (Express): সাধারণত ৭ থেকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে দেওয়া হয়ে থাকে।
  • অতি জরুরি (Super Express): স্থায়ী ঠিকানা সংক্রান্ত সকল তথ্য যদি আগে থেকে পুলিশ ভেরিফাইড থাকে, তবে সাধারণত ২ থেকে ৩ কর্মদিবসের মধ্যে এই পাসপোর্ট পাওয়া যায়।

ই-পাসপোর্ট আবেদন বাতিল বা সমস্যা হলে কী করবেন?

আবেদনে বড় ধরণের ভুল থাকলে বা তথ্য ম্যাচ না করলে প্রক্রিয়াকরণ সাময়িকভাবে স্থগিত হতে পারে। সমস্যা দূর করতে যে পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করা দরকার:

  • সরাসরি পাসপোর্ট অফিসে যোগাযোগ: যদি স্ট্যাটাসে কোনো ত্রুটি দেখায়, তবে আপনার আবেদনের এনরোলমেন্ট স্লিপ নিয়ে সরাসরি আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের ‘ইনকোয়ারি’ বা সহকারী পরিচালকের কক্ষে পরামর্শ নিন।
  • আবেদন বাতিল বা সংশোধন: বায়োমেট্রিক দেওয়ার আগে অনলাইন আইডি থেকে দরখাস্ত রি-এডিট করা যায়। তবে বায়োমেট্রিক দেওয়া হয়ে গেলে অফিসে লিখিত আবেদন দিয়ে পূর্বের আবেদন সংশোধন বা বাতিল করে নতুন পদক্ষেপ নিতে হয়।
  • হেল্পলাইন ব্যবহার: যেকোনো প্রাথমিক তথ্যের জন্য পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অফিশিয়াল হটলাইন বা সাপোর্ট ই-মেইলে তথ্য অনুসন্ধান করতে পারেন।

ই-পাসপোর্ট আবেদন নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)

১. ই-পাসপোর্ট করতে NID কি বাধ্যতামূলক?

১৮ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) থাকা বাধ্যতামূলক। তবে ১৮ বছরের নিচে বয়সীদের ক্ষেত্রে অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদপত্র দিয়ে আবেদন করার ব্যবস্থা রয়েছে।

২. ১৭ ডিজিটের জন্মনিবন্ধন ছাড়া কি ই-পাসপোর্ট আবেদন সম্ভব?

না, যদি জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে আবেদন করতে হয় তবে সেটি অবশ্যই ডিজিটাল ও ১৭ ডিজিটের হতে হবে। হাতে লেখা জন্মসনদ গ্রহণ করা হয় না।

৩. ফি কোথায় এবং কীভাবে জমা দেব?

অনলাইনে ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে সরাসরি ফি দেওয়া যায়। এছাড়া এ-চালানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া সম্ভব।

৪. আবেদন করার পর ফি ফেরত নেওয়া যাবে?

না, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একবার পাসপোর্ট ফি পরিশোধ করা হলে তা আর ফেরত পাওয়া যায় না।

৫. পুলিশ ভেরিফিকেশন কি সবার জন্য লাগে?

নতুন আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রয়োজন হয়। তবে পুরোনো পাসপোর্টের তথ্য অপরিবর্তিত রেখে রিনিউ করলে সাধারণত নতুন করে দীর্ঘ পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন হয় না।

৬. ভুল তথ্য সাবমিট হয়ে গেলে সংশোধন কীভাবে করব?

বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলার আগে আবেদন এনরোল না হওয়া পর্যন্ত পরিবর্তন করা সহজ। অফিসে গিয়ে কর্মকর্তা মাধ্যমে তথ্য ঠিক করা যায়। তবে বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হয়ে গেলে আবেদন বাতিলের দরখাস্ত করতে হতে পারে।

৭. ই-পাসপোর্ট আবেদনের পর পাসপোর্ট নম্বর কত দিনে পাওয়া যায়?

অনুমোদন (Approval) পেয়ে পাসপোর্ট যখন প্রিন্ট অপশনে যায়, তখনই আপনার এনরোলমেন্টের বিরুদ্ধে নতুন পাসপোর্ট নম্বরটি জেনারেট বা তৈরি হয়।

৮. আগের এমআরপি (MRP) থাকলে তা কি জমা দিতে হবে?

হ্যাঁ, বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়ার দিন এবং পরবর্তীতে নতুন ই-পাসপোর্ট গ্রহণের দিনে আপনার পূর্বের পুরোনো এমআরপি বা ই-পাসপোর্টের মূল কপি প্রদর্শন ও ক্যানসেল করানোর জন্য জমা দিতে হয়।

৯. পাসপোর্ট ডেলিভারি নিতে অন্য কেউ যেতে পারবে?

জরুরি ক্ষেত্র ব্যতীত পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকারীর নিজেকেই সরাসরি উপস্থিত হয়ে ডেলিভারি স্লিপ ও পুরোনো পাসপোর্ট জমা দিয়ে বায়োমেট্রিক যাচাই শেষে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে হয়।

১০. ই-পাসপোর্ট আবেদনের মেয়াদ কতদিন থাকে?

অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করে ফি জমা দেওয়ার পর অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুযায়ী সুবিধাজনক সময়ে বায়োমেট্রিক দিতে যেতে পারেন। সাধারণত এটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পোর্টালে সংরক্ষিত থাকে।

শেষ কথা

ই-পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম জানা থাকলে অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়াটি যেমন ঝামেলামুক্ত হয়, তেমনি আপনার অর্থ ও সময়ের সঠিক ব্যবহার সুনিশ্চিত হয়। অনলাইনে নিজ হাতে ফর্ম পূরণ করার সময় প্রতিটি তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সাথে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মিলিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। ই-পাসপোর্ট সংক্রান্ত নিয়মাবলি যেকোনো সময় পরিমার্জন হতে পারে, তাই আবেদন শুরু করার পূর্বে সরকারি পোর্টালে চোখ রেখে সর্বশেষ নির্দেশনাগুলো যাচাই করে নিন।


Spread the love
Telegram chanel Join our Telegram channel
Join
LekhokBD.me

আমি রিফাত, LekhokBD.me এর প্রতিষ্ঠাতা। আমি পেশায় একজন ছাত্র, বর্তমানে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত রয়েছি। লেখাপড়ার পাশাপাশি,বাংলাদেশের নাগরিক সেবা সংক্রান্ত তথ্য যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে LekhokBD তে সহজ ভাবে তুলে ধরে, মানুষের কাছে তথ্যকে সহজলভ্য করাই আমার মূল লক্ষ্য।

Leave a Comment