একটি পাসপোর্ট কেবল ভ্রমণের দলিল নয়, আন্তর্জাতিকভাবে আপনার পরিচয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বর্তমানে বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট সেবা পুরোপুরি চালু রয়েছে এবং বেশিরভাগ আবেদনকারী দীর্ঘমেয়াদি সুবিধার জন্য ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের দিকেই ঝুঁকছেন। বারবার পাসপোর্ট নবায়নের ঝামেলা এড়াতে এটি বেশ সুবিধাজনক। কিন্তু আবেদন করার আগে সঠিক প্রস্তুতি না থাকলে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে অযথা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে এবং কীভাবে আবেদন করতে হয়—তা পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আপনি যদি প্রথমবার পাসপোর্ট করতে চান কিংবা পুরোনো পাসপোর্ট পরিবর্তন করে ই-পাসপোর্ট নেওয়ার পরিকল্পনা করেন, তবে এই লেখাটি আপনার জন্য। সরকারি নিয়ম মেনে সহজ ভাষায় পুরো প্রক্রিয়াটি নিচে তুলে ধরা হলো।
১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট কারা করতে পারেন?
বাংলাদেশ সরকারের ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্টের ক্ষেত্রে কিছু বয়সভিত্তিক নির্দেশনা রয়েছে। সবাই এই মেয়াদের জন্য আবেদন করতে পারেন না। নিচে যোগ্যতা সংক্ষেপে দেওয়া হলো:
বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি: ১৮ বছর থেকে ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত সব নাগরিক ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য: আবেদনকারীর বয়স যদি ১৮ বছরের কম হয়, তবে তিনি কেবল ৫ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট পাবেন। তাদের ক্ষেত্রে ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট প্রযোজ্য নয়।
৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য: প্রবীণ নাগরিকদের (যাদের বয়স ৬৫ বছরের বেশি) সুবিধার জন্য সরকার ৫ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট প্রদান করে থাকে।
আপনি যদি ১৮ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হয়ে থাকেন, তবেই ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে পারবেন।
১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে?
পাসপোর্টের আবেদনপত্র জমা দেওয়া এবং বায়োমেট্রিক প্রদানের সময় সঠিক কাগজপত্র সঙ্গে থাকা বাধ্যতামূলক। আবেদনকারীর বয়স, পেশা ও বর্তমান তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নথিপত্রের তালিকা কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে তার একটি মূল তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের নাগরিকদের জন্য মূল জাতীয় পরিচয়পত্র এবং এর সত্যায়িত/স্পষ্ট ফটোকপি জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। ই-পাসপোর্টের সব তথ্য NID অনুযায়ী যাচাই করা হয়।
- অনলাইন আবেদনপত্রের সারাংশ (Application Summary): অনলাইনে সফলভাবে আবেদন সম্পন্ন করার পর যে সামারি বা সারসংক্ষেপ পেজটি পাওয়া যায়, তার প্রিন্ট কপি।
- আবেদন ফি পরিশোধের চালান (Payment Slip): ব্যাংকে জমা দেওয়া চালানের মূল কপি অথবা অনলাইন পেমেন্টের রসিদের প্রিন্ট কপি।
- পূর্ববর্তী পাসপোর্ট (যদি থাকে): আগে যদি আপনার কোনো হাতে লেখা (ম্যানুয়াল) বা ডিজিটাল (MRP) পাসপোর্ট থেকে থাকে, তবে সেই মূল পাসপোর্ট এবং তার ফটোকপি সাথে নিতে হবে।
- পেশাগত সনদ বা প্রমানপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে): সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় কর্মরতদের জন্য NOC (No Objection Certificate) বা GO (Government Order) লাগবে। বেসরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী বা অন্যান্য পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিচয়পত্র বা প্রয়োজনীয় সনদ সাথে রাখা ভালো।
- বৈবাহিক অবস্থার সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে): আবেদনপত্রে বৈবাহিক অবস্থা বিবাহিত উল্লেখ করলে স্বামী বা স্ত্রীর NID-এর কপি এবং নিকাহনামা/ম্যারেজ সার্টিফিকেট সাথে রাখা নিরাপদ।
- বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ: আবেদনকারীর বর্তমান ঠিকানা ও স্থায়ী ঠিকানা ভিন্ন হলে বা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের আওতাভিত্তিক প্রমাণের জন্য ইউটিলিটি বিলের (বিদ্যুৎ, গ্যাস বা পানি) কপি প্রয়োজন হতে পারে।
মনে রাখবেন, ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে তা নিশ্চিত করার সময় আপনার মূল এনআইডির তথ্যের সাথে আবেদনের তথ্যের যেন শতভাগ মিল থাকে।
১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট আবেদনের নিয়ম
বর্তমানে ই-পাসপোর্টের সম্পূর্ণ আবেদন প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করা যায়। আপনি নিজে থেকেই ধাপে ধাপে আবেদন ফরম পূরণ করতে পারবেন। নিচে আবেদন পদ্ধতির বিবরণ দেওয়া হলো:
- অনলাইনে আবেদন শুরু: বাংলাদেশ ই-পাসপোর্টের অফিসিয়াল পোর্টালে (epassport.gov.bd) প্রবেশ করে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন। এরপর “Apply Online” অপশনে ক্লিক করে প্রক্রিয়া শুরু করুন।
- ব্যক্তিগত তথ্য পূরণ: আপনার নাম, পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ ও লিঙ্গ সঠিকভাবে লিখুন। মনে রাখবেন, এই তথ্যগুলো অবশ্যই আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) সাথে হুবহু মিলতে হবে।
- ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য দেওয়া: আপনার স্থায়ী ঠিকানা এবং বর্তমান ঠিকানা সঠিকভাবে দিন। দুটি ঠিকানা একই হলে সেই অপশনটি নির্বাচন করুন।
- পাসপোর্টের মেয়াদ ও ধরন নির্বাচন: এই ধাপে আপনাকে পাসপোর্টের পাতা (৪৮ পাতা নাকি ৬৪ পাতা) এবং মেয়াদের স্থান থেকে ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট বেছে নিতে হবে।
- আবেদন জমা: সব তথ্য পুনরায় ভালো করে রিভিশন দিয়ে আবেদন ফরমটি চূড়ান্তভাবে সাবমিট করুন।
- ফি পরিশোধ: আবেদন জমা দেওয়ার পর নির্ধারিত ফি অনলাইনে (বিকাশ, রকেট, নগদ, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড) অথবা নির্দিষ্ট ব্যাংকের চালানের মাধ্যমে পরিশোধ করুন।
- নির্ধারিত কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া: আবেদন করার পর দেওয়া তারিখ ও সময়ে আপনার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রয়োজনীয় মূল কাগজপত্র ও ফটোকপিসহ উপস্থিত হোন।
- ছবি, আঙুলের ছাপ ও প্রয়োজনীয় বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করা: পাসপোর্ট কেন্দ্রে আপনার ডিজিটাল ছবি তোলা হবে, ১০ আঙুলের ছাপ নেওয়া হবে এবং চোখের আইরিশ স্ক্যান করা হবে। বায়োমেট্রিক শেষ হলে আপনাকে একটি ডেলিভারি স্লিপ দেওয়া হবে।
ই-পাসপোর্টের ফি কত?
ই-পাসপোর্টের ফি মূলত পাতার সংখ্যা (৪৮ পাতা বা ৬৪ পাতা) এবং বিতরণের গতির ওপর নির্ভর করে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্টের সাধারণ ফি তালিকা নিচে দেওয়া হলো (১৫% ভ্যাটসহ):
৪৮ পাতার ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট:
- নিয়মিত (Regular) বিতরণ (১৫ কর্মদিবস): ৫,৭৫০ টাকা।
- জরুরি (Express) বিতরণ (৭ কর্মদিবস): ৮,০৫০ টাকা।
- অত্যন্ত জরুরি (Super Express) বিতরণ (২ কর্মদিবস): ১০,৩৫০ টাকা।
৬৪ পাতার ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট:
- নিয়মিত বিতরণ: ৮,০৫০ টাকা।
- জরুরি বিতরণ: ১০,৩৫০ টাকা।
- অত্যন্ত জরুরি বিতরণ: ১২,৬৫০ টাকা।
নোট: অত্যন্ত জরুরি সেবার ক্ষেত্রে নতুন পাসপোর্টের জন্য আগে থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট জমা দিতে হতে পারে।
আবেদনের সময় যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
ছোটখাটো ভুলের কারণে পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হতে পারে। আবেদন করার সময় নিচের বিষয়গুলোতে সতর্ক থাকুন:
- বানানের গরমিল: এনআইডি কার্ডের ইংরেজি বানানের সাথে আবেদনের ইংরেজি বানানের অমিল থাকলে আবেদন আটকে যেতে পারে।
- মেয়াদ নির্বাচনে ভুল: বয়স ১৮-এর নিচে হওয়া সত্ত্বেও ১০ বছর মেয়াদি অপশন নির্বাচন করা।
- ভুল ঠিকানার তথ্য: বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার পুলিশ ভেরিফিকেশন সহজ করতে সঠিক থানার নাম ও পোস্টাল কোড লিখুন।
- ভুল পাসপোর্ট ক্যাটাগরি: পুরোনো পাসপোর্ট থাকলে তা আড়াল করবেন না। রি-ইস্যু আবেদনের ক্ষেত্রে আগের পাসপোর্টের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক।
আবেদন করার আগে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
আবেদন জমা দেওয়ার জন্য পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার আগে আপনার ফাইলটি ভালোভাবে গুছিয়ে নিন। সমস্ত মূল নথিপত্র এবং সেগুলোর এক সেট ফটোকপি আলাদা ফোল্ডারে রাখুন। আবেদনের সামারি কপি ও চালানের কপির প্রিন্ট স্পষ্ট হওয়া দরকার। এছাড়া, ই-পাসপোর্টের ছবিতে চেহারার স্পষ্টতা গুরুত্বপূর্ণ, তাই পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার দিন শালীন ও সাধারণ পোশাক পরা ভালো।
ই-পাসপোর্ট আবেদন করার সম্পূর্ণ নিয়ম ২০২৬: অনলাইনে ফর্ম পূরণ থেকে ফি জমা পর্যন্ত
পাসপোর্ট করার পুরো প্রক্রিয়াটি এখন অনেক আধুনিক ও সহজ করা হয়েছে। ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে এবং কীভাবে সঠিক পদ্ধতিতে আবেদন করতে হয়, তা জেনে কাজ করলে কোনো অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় পড়তে হয় না। সরকারি নিয়ম বা ফি সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্যের জন্য সব সময় বাংলাদেশ ই-পাসপোর্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুসন্ধান করাই বুদ্ধিমানের কাজ।