ইদানীং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই নানা ধরনের ভিডিও চোখে পড়ে। কোনো ভিডিও দেখে মনে হয় ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছে, আবার কিছু ভিডিও এতটাই নিখুঁত যে সেটি আসল নাকি কৃত্রিমভাবে তৈরি, তা বোঝা কঠিন হয়ে যায়। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ভিডিও এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তব মনে হয়।
এ ধরনের ভিডিও বিনোদনের জন্য তৈরি হতে পারে, আবার কখনো মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, কাউকে বিব্রত করা কিংবা মানুষকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা হয়। তাই কোনো ভিডিও দেখেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কয়েকটি বিষয় একটু খেয়াল করলেই অবশ্য কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
এই লেখায় এমন সাতটি সহজ উপায় নিয়ে আলোচনা করা হলো, যেগুলো অনুসরণ করে আপনি কোনো ভিডিও কৃত্রিমভাবে তৈরি কি না, তা যাচাই করার প্রাথমিক ধারণা পেতে পারেন।
১. মুখের অভিব্যক্তি ও চোখের নড়াচড়া খেয়াল করুন
কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও চেনার ক্ষেত্রে সবার আগে মানুষের মুখের দিকে তাকানো যেতে পারে। বাস্তব মানুষের চোখের পাতা পড়া, তাকানোর ভঙ্গি এবং মুখের অভিব্যক্তিতে স্বাভাবিক কিছু পরিবর্তন থাকে। কিন্তু কৃত্রিম ভিডিওতে অনেক সময় এসব বিষয় পুরোপুরি স্বাভাবিক থাকে না।
ভিডিওটি মনোযোগ দিয়ে দেখলে দেখা যেতে পারে, চোখের পাতা অস্বাভাবিকভাবে নড়ছে অথবা চোখের দৃষ্টি মুখের অন্যান্য অঙ্গভঙ্গির সঙ্গে ঠিক মিলছে না। কখনো মুখের হাসি বা ভ্রুর নড়াচড়াও কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে।
তবে শুধু চোখ বা মুখের একটি বিষয় দেখে নিশ্চিত হওয়া উচিত নয়। কারণ বর্তমানে উন্নত কৃত্রিম প্রযুক্তিতে এসব ত্রুটির অনেকটাই কমে গেছে।
২. ঠোঁটের নড়াচড়া ও কথার মিল দেখুন
কেউ কথা বলছে এমন ভিডিও হলে তার ঠোঁটের নড়াচড়া ভালোভাবে লক্ষ্য করুন। কথার সঙ্গে ঠোঁটের নড়াচড়া ঠিকমতো মিলছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
কৃত্রিমভাবে তৈরি কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যক্তি একটি শব্দ বলার আগেই বা পরে ঠোঁট নড়ছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুখের নড়াচড়া ঠিক থাকলেও শব্দের সঙ্গে মুখের ভঙ্গির মধ্যে সামান্য অমিল থাকে।
বিশেষ করে দ্রুত কথা বলা, হাসা কিংবা আবেগপূর্ণ কোনো কথা বলার সময় এই অমিল চোখে পড়তে পারে। তাই সন্দেহজনক ভিডিও হলে শুধু বক্তব্য শুনবেন না, মুখের নড়াচড়ার দিকেও নজর দিন।
৩. হাত, আঙুল ও শরীরের নড়াচড়া দেখুন
মানুষের হাতের আঙুল, শরীরের ভঙ্গি এবং বিভিন্ন অঙ্গের নড়াচড়া কৃত্রিমভাবে নিখুঁতভাবে তৈরি করা এখনো অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ভিডিওতে এসব জায়গায় অস্বাভাবিকতা দেখা যেতে পারে।
আরো পড়ুনঃ
চার্জে থাকা অবস্থায় স্মার্টফোন ব্যবহার করলে কি ব্যাটারির ক্ষতি হয়? জানুন সঠিক নিয়ম
যেমন কারও আঙুলের সংখ্যা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, হাতের আকৃতি হঠাৎ বদলে যেতে পারে অথবা কোনো জিনিস ধরার সময় হাতের সঙ্গে বস্তুটির অবস্থান ঠিকভাবে না-ও মিলতে পারে। হাঁটা বা ঘোরার সময় শরীরের কোনো অংশও অস্বাভাবিকভাবে নড়তে পারে।
ভিডিও খুব দ্রুত দেখলে এসব বিষয় চোখ এড়িয়ে যায়। তাই সন্দেহ হলে ভিডিওটি ধীরে চালিয়ে কয়েকবার দেখুন।
৪. আলো ও ছায়ার দিকে নজর দিন
বাস্তব কোনো দৃশ্যের আলো ও ছায়ার মধ্যে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক থাকে। একজন মানুষ যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানকার আলো অনুযায়ী তার মুখ, পোশাক এবং শরীরে ছায়া পড়বে। আশপাশের বস্তুতেও একই আলোর প্রভাব দেখা যাওয়ার কথা।
কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিওতে কখনো কখনো এই হিসাব ঠিক থাকে না। মুখের এক পাশে আলো থাকলেও শরীরের অন্য অংশে তার প্রভাব দেখা যায় না। আবার মানুষের ছায়া একদিকে থাকলেও আশপাশের বস্তুর ছায়া অন্যদিকে দেখা যেতে পারে।
এ ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা গেলে ভিডিওটি নিয়ে একটু সতর্ক হওয়া ভালো।
৫. পেছনের দৃশ্য ও ছোটখাটো জিনিস খেয়াল করুন
ভিডিওর মূল ব্যক্তির দিকে তাকিয়েই আমরা সাধারণত পুরো ভিডিও দেখি। কিন্তু কৃত্রিম ভিডিও চেনার জন্য অনেক সময় পেছনের দৃশ্য দেখা বেশি কাজে দেয়।

পেছনে থাকা মানুষের মুখ, দোকানের লেখা, গাড়ির নম্বর, দেয়ালের লেখা, জানালা কিংবা অন্যান্য ছোট জিনিস ভালোভাবে দেখুন। এসব জায়গায় অস্বাভাবিকতা থাকতে পারে। কোনো লেখা অস্পষ্ট বা এলোমেলো হতে পারে, একই জিনিসের আকার হঠাৎ বদলে যেতে পারে কিংবা পেছনের কোনো মানুষ কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।
তাই সন্দেহজনক ভিডিও হলে শুধু সামনে থাকা ব্যক্তিকে নয়, পুরো দৃশ্যটিকে একবার দেখার চেষ্টা করুন।
৬. ভিডিওর উৎস ও ঘটনার সত্যতা যাচাই করুন
কোনো ভিডিও সত্য কি না বোঝার সবচেয়ে ভালো উপায়গুলোর একটি হলো এর উৎস খুঁজে দেখা। ভিডিওটি প্রথম কোথায় প্রকাশ করা হয়েছে, কে প্রকাশ করেছে এবং ঘটনাটি নিয়ে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদ বা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা দেখুন।
ধরুন, একটি ভিডিওতে দাবি করা হলো কোনো পরিচিত ব্যক্তি একটি বিশেষ কথা বলেছেন। তাহলে শুধু ওই ভিডিও দেখে বিশ্বাস না করে বিষয়টি নিয়ে অন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচিত মাধ্যমেও তথ্য খুঁজে দেখুন।
অনেক সময় পুরোনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আবার এক দেশের ভিডিও অন্য দেশের ঘটনা বলে প্রচার করা হয়। তাই ভিডিওর দৃশ্য বাস্তব হলেও ভিডিওটির সঙ্গে দেওয়া তথ্য মিথ্যা হতে পারে।
৭. অস্বাভাবিক শব্দ ও কণ্ঠস্বর শুনুন
ভিডিওর দৃশ্যের পাশাপাশি শব্দের দিকেও মনোযোগ দেওয়া দরকার। কৃত্রিমভাবে তৈরি কণ্ঠস্বর অনেক সময় মানুষের মতো শোনালেও কথার গতি, আবেগ এবং উচ্চারণে সামান্য অস্বাভাবিকতা থাকতে পারে।
কোনো কোনো ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যক্তি খুব আবেগপূর্ণ কথা বলছেন কিন্তু কণ্ঠে সেই আবেগের কোনো পরিবর্তন নেই। কোথাও শব্দের মধ্যে অস্বাভাবিক বিরতি থাকতে পারে, আবার কখনো কোনো শব্দের উচ্চারণ স্বাভাবিক মনে নাও হতে পারে।
তবে এখানেও একই কথা প্রযোজ্য—শুধু কণ্ঠস্বর শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। দৃশ্য, শব্দ, উৎস এবং ঘটনার তথ্য—সবকিছু মিলিয়ে বিচার করা উচিত।
কৃত্রিম ভিডিও দেখলে কী করবেন?
কোনো ভিডিও দেখে সন্দেহ হলে সঙ্গে সঙ্গে সেটি অন্যদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে ভিডিওতে যদি কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সম্পর্কে গুরুতর দাবি থাকে, তাহলে আগে তথ্যটি যাচাই করুন।
ভিডিওটি কোথা থেকে এসেছে সেটি দেখুন, একই ঘটনার অন্য ভিডিও খুঁজুন এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রে তথ্য মিলিয়ে নিন। প্রয়োজন হলে ভিডিওটির একটি নির্দিষ্ট অংশ থামিয়ে ভালোভাবে দেখুন।
মনে রাখতে হবে, কৃত্রিম ভিডিও শনাক্ত করার কোনো একটি লক্ষণ সবসময় নির্ভুল নয়। প্রযুক্তি দ্রুত উন্নত হচ্ছে। আজ যে ত্রুটি দেখে একটি ভিডিও সহজে চেনা যায়, ভবিষ্যতে সেই ত্রুটি আর নাও থাকতে পারে।
সবশেষে
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ভিডিও এখন এতটাই বাস্তব হতে পারে যে শুধু চোখে দেখে অনেক সময় সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন। তাই কোনো ভিডিও দেখে অবাক হওয়া বা আবেগপ্রবণ হওয়ার আগে একটু থেমে যাচাই করা ভালো।
মুখের অভিব্যক্তি, চোখ ও ঠোঁটের নড়াচড়া, হাত ও শরীরের অঙ্গভঙ্গি, আলো-ছায়া, পেছনের দৃশ্য, ভিডিওর উৎস এবং কণ্ঠস্বর—এই সাতটি বিষয় খেয়াল করলে সন্দেহজনক ভিডিও সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ভিডিও সত্য মনে হলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া যাবে না। যাচাই না করে শেয়ার না করাই সবচেয়ে নিরাপদ অভ্যাস। এতে আপনি নিজে ভুল তথ্য থেকে যেমন বাঁচবেন, তেমনি অন্যদের কাছেও ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়া কমবে।